ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

ঝুঁকিতে লাখ লাখ শিশু, শঙ্কায় স্বাস্থ্য খাত

গণ-টিকাদানেও রোখা যাচ্ছে না হাম, আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ২৮ জুলাই, ২০২৬ সময় : ১১:৫৪ এএম

দেশজুড়ে মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধি হামের যে ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, তা কমার কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ হাম ও রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরুর দুই মাসের বেশি সময় পার হয়ে গেলেও দেশে আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল থামানো যাচ্ছে না। স্বাস্থ্য খাতের দাপ্তরিক হিসাবে গত মে মাসের ১৫ তারিখ থেকে চলতি জুলাই মাসের ২৭ তারিখ পর্যন্ত সারা দেশে হামের বিভিন্ন উপসর্গ নিয়ে অন্তত ৮২৫ জন শিশুর করুণ মৃত্যু হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রতিদিন নতুন করে আরও প্রায় ১ হাজার শিশু এই মরণঘাতী ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, একই সময়ে সরকারের নিজস্ব তথ্যে উঠে এসেছে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির মূল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ শিশু, অথচ সমবয়সী শিশুদের জন্য পরিচালিত জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ। অর্থাৎ, দেশের টিকাদান ও পুষ্টি কর্মসূচির দুটি ভিন্ন হিসাবের মধ্যে প্রায় ৪৬ লাখ শিশুর এক বিশাল বৈষম্য ও পার্থক্য রয়ে গেছে।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, রোগের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় প্রথমে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলা ও পৌরসভায় গত এপ্রিল মাসের ৫ তারিখে বিশেষ এই টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়। পরবর্তীতে এপ্রিল মাসের ৮ তারিখে চার সিটি করপোরেশন এবং ২০ তারিখ থেকে দেশজুড়ে তা সম্প্রসারণ করা হয়। কর্মসূচির আওতায় ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী মোট ১ কোটি ৮০ লাখ ১৫ হাজার ৬৪ জন শিশুকে টিকার আওতায় আনার প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছিল। এর বিপরীতে শেষ পর্যন্ত টিকা দেওয়া সম্ভব হয়েছে ১ কোটি ৮৪ লাখ ৮০ হাজারের বেশি শিশুকে, যা শতকরা হিসাবে শতভাগ ছাড়িয়ে ১০৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

তবে বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সংকট নিরসনে নীতি নির্ধারকেরা কেবল গণ-টিকাদান কর্মসূচির ওপরই অতিরিক্ত নির্ভর করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু শুধু টিকার ওপর ভরসা না করে দ্রুত নতুন রোগী শনাক্তকরণ, আক্রান্ত শিশুদের অবিলম্বে আলাদা রাখা বা আইসোলেশন নিশ্চিত করা, সামাজিক জনসচেতনতা বাড়ানো, সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার, হাসপাতালগুলোর উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সার্বক্ষণিক নিবিড় নজরদারির মতো সমন্বিত জনস্বাস্থ্যভিত্তিক পদক্ষেপে গভীর ঘাটতি ছিল। ফলে বিপুল পরিমাণ টিকা প্রয়োগ করা সত্ত্বেও ভাইরাসের ছড়ানোর শৃঙ্খল বা সংক্রমণ চক্র কোনোভাবেই ভাঙা সম্ভব হয়নি।

বর্তমানে তিন বছর দুই মাস বয়সী শিশু আরাফাত সাজিদ নামের এক শিশু নিয়মানুগভাবে টিকার পূর্ণ ডোজ পাওয়ার পরও আক্রান্ত হয়েছে। ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় নির্ধারিত সময়ে হাম ও রুবেলা টিকার দুটি ডোজই পেয়েছিল সে। এমনকি দেশজুড়ে প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পর চালুর হওয়া বিশেষ টিকাদান কর্মসূচিতেও তাকে অতিরিক্ত টিকা দেওয়া হয়। তা সত্ত্বেও সব টিকার ডোজ সম্পন্ন করার পরও সম্প্রতি হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুটিকে রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ভর্তি করাতে হয়েছে।

সাজিদের মা সুমি আক্তার চরম হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, জন্মপরবর্তী সময় থেকে তাঁর সন্তানের তেমন কোনো বড় শারীরিক জটিলতা ছিল না। টানা দুই বছর সম্পূর্ণ মাতৃদুগ্ধ পান করে সে বড় হয়েছে এবং নিয়মানুযায়ী সময়মতো সব ধরণের প্রতিষেধক টিকাও গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে দেশে হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে তিনি ছেলেকে নিয়ে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন এবং অপ্রয়োজনে ঘরের বাইরে পর্যন্ত বের হননি। তা সত্ত্বেও তাঁর শিশু কীভাবে এমন মরণঘাতী রোগে আক্রান্ত হলো, তা তাঁর কাছে এখনো এক অজানা রহস্য।

একই হাসপাতালে ভর্তি থাকার পর গত ২৪ জুলাই হামের সঙ্গে লড়াই করে না ফেরার দেশে চলে যায় মাত্র ১০ মাস বয়সী শিশু হাফসা। শিশুটির বাবা মামুন আহমেদ জানান, হাফসাও দেশব্যাপী পরিচালিত বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির অংশ হিসেবে নিয়মিত টিকা পেয়েছিল। তিনি জানান, গত মাসের ১৪ তারিখ রাতে হঠাৎ মেয়ের কাশি ও তীব্র জ্বর শুরু হয়। এরপর নিকটস্থ বাউফল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে সেখানকার দায়িত্বরত চিকিৎসকেরা বেশ কিছু ওষুধ দেন। তবে ওষুধ খাওয়ার পরও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানে ভর্তির পর শিশুটির শরীরে হামের মূল উপসর্গ অর্থাৎ লালচে ফুসকুড়ি বা র‍্যাশ দেখা দেয়। অবস্থার আরও অবনতি হলে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে তড়িঘড়ি করে ঢাকায় এনে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করানো হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে অবুঝ শিশুটি।

এদিকে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যৌথ কেসভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, হামে মারা যাওয়া শিশুদের মধ্যে ৩৩৭ জনের প্রাপ্ত তথ্য গভীর বিশ্লেষণ করে জানা গেছে যে ৯১ দশমিক ৫ শতাংশ শিশুর কোনো প্রকার টিকাই দেওয়া ছিল না। জুলাই মাসের ১৪ তারিখ পর্যন্ত মারা যাওয়া এই ৩৩৭ শিশুর তথ্যপ্রমাণ থেকে জানা যায়, তাদের মধ্যে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ মাত্র এক ডোজ এবং ২ দশমিক ১ শতাংশ দুই বা তার বেশি ডোজ টিকা নিয়েছিল। এর বাইরে সবচেয়ে মর্মান্তিক তথ্য হলো, প্রাণ হারানো ২৪ শতাংশ শিশুর বয়স এতটাই কম ছিল যে তাদের আদৌ টিকা নেওয়ার উপযুক্ত বয়সই হয়নি। মূলত টিকার সুবিধা থেকে বঞ্চিত ও বয়সের কারণে অরক্ষিত থাকাই তাদের অকাল মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জাতীয় সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সার্বিক তথ্যানুসারে, হাসপাতালে হামের নানা শারীরিক উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা ৬৬ হাজার ৬৯০ জন রোগীর মধ্যে ৭৮ দশমিক ৬ শতাংশই কোনো ধরনের প্রতিষেধক টিকা গ্রহণ করেনি। আক্রান্তদের মধ্যে এক ডোজ টিকা পেয়েছিল ১০ দশমিক ৯ শতাংশ এবং দুই ডোজের পূর্ণ টিকা পেয়েছিল ১০ দশমিক ৫ শতাংশ। বিপরীত দিকে, ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া ১৪ হাজার ৮৪৯ জন নিশ্চিত হাম রোগীর মধ্যে ৮০ শতাংশই ছিল সম্পূর্ণ টিকাবঞ্চিত। মাত্র ৮ দশমিক ৪ শতাংশ এক ডোজ এবং ১২ শতাংশ শিশু দুই ডোজ টিকা গ্রহণ করেছিল।

মারা যাওয়া ৩৩৭ শিশুর বয়সের সার্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোট মৃতের ২২ শতাংশের বয়স ছিল মাত্র ৬ মাসের কম, ৩০ শতাংশের বয়স ছিল ৬ থেকে ৯ মাস, ২৫ শতাংশের বয়স ছিল ৯ থেকে ১১ মাস, ১৭ শতাংশের বয়স ছিল ১ থেকে ৪ বছর, ৩ শতাংশের বয়স ছিল ৫ থেকে ৯ বছর এবং ১০ বছরের বেশি বয়সী রোগী ছিল ৩ শতাংশ। অন্যদিকে টিকাবঞ্চিতদের প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, মৃতদের মধ্যে ২৪ শতাংশের বয়স ৬ মাসের কম হওয়ায় তারা টিকা নেওয়ার যোগ্য ছিল না। এছাড়া ৩২ শতাংশের বয়স ৬ থেকে ৯ মাস, ২৫ শতাংশের ৯ মাস থেকে ১ বছর, ১৪ শতাংশের ১ থেকে ৪ বছর, ২ শতাংশের ৫ থেকে ৯ বছর এবং ১০ বছরের ঊর্ধ্বের ছিল ৩ শতাংশ।

হামের ভাইরাস অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় প্রাদুর্ভাবের শুরু থেকেই সামাজিক সচেতনতা ও সামষ্টিক উদ্যোগ নেওয়া অতি জরুরি ছিল। যেমন শিশুদের মধ্যে জ্বর দেখা দিলে তৎক্ষণাৎ অন্যদের থেকে আলাদা করা, ঘন ঘন সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস করা, বাচ্চাদের মাস্ক পরতে উৎসাহিত করা এবং সর্বোপরি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জোর প্রচারণা চালানোর প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে এসব জনস্বাস্থ্যভিত্তিক পদক্ষেপে মারাত্মক শিথিলতা লক্ষ করা গেছে।

হাম ও রুবেলা নির্মূল কার্যক্রম যাচাইয়ে গঠিত জাতীয় কমিটির (এনভিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান এ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, হামের মতো জটিল সংক্রামক ব্যাধি মোকাবিলায় দেশ মূলত কেবল টিকাদানের ওপর ভরসা করে বসে আছে। অথচ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত নিয়ম অনুযায়ী টিকার পাশাপাশি একেবারে শুরু থেকেই করোনাভাইরাস মহামারির মতো সমন্বিত জনস্বাস্থ্যভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা পদক্ষেপ গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সরকার বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসন সেদিকে কার্যকর কোনো নজর দেয়নি।

অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান আরও উল্লেখ করেন, বর্তমানে মোট আক্রান্তদের প্রায় ২৪ শতাংশেরই বয়স ছয় মাসের নিচে। আর সামগ্রিক আক্রান্তের প্রায় ৫২ শতাংশের বয়সই এক বছরের কম। এমনকি টিকা নেওয়ার পরও শতকরা আড়াই ভাগ শিশু নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে। টিকা নেওয়ার নির্দিষ্ট বয়স হওয়ার আগেই শিশুদের এমন ব্যাপক হারে হামে আক্রান্ত হওয়ার পেছনে একাধিক বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে শিশুদের শারীরিক অপুষ্টি, গর্ভধারণকারী মায়ের অপুষ্টি, প্রয়োজনীয় ভিটামিন ‘এ’-এর মারাত্মক ঘাটতি, অন্য কোনো জটিল বা দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত থাকা এবং পর্যাপ্ত মাতৃদুগ্ধ না পাওয়া অন্যতম। বিগত তিন-চার বছর ধরেই যেসব শিশুর টিকাদানের বয়স হয়নি, তাদের মধ্যে সংক্রমিত হওয়া এবং মারা যাওয়ার নজির বাড়ছে, তবে চলতি বছরে এসে এই হার অস্বাভাবিক ও আশঙ্কাজনক রূপ ধারণ করেছে।

পরিস্থিতি কবে নাগাদ স্বাভাবিক হতে পারে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এখনো সময় শেষ হয়ে যায়নি, অবিলম্বে একটি সমন্বিত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা দরকার। মাঠপর্যায়ে টিকাদানের পাশাপাশি অন্যান্য জনস্বাস্থ্যবিষয়ক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার না করলে সহজে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনা অসম্ভব হয়ে পড়বে। দীর্ঘদিন ধরে আমরা নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পরামর্শ ও সুপারিশ দিয়ে আসলেও তা মাঠপর্যায়ে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না।

সাধারণ স্বাস্থ্যবিজ্ঞান অনুযায়ী হাম ও রুবেলার প্রতিষেধক টিকা দেওয়ার ৩ থেকে ৪ সপ্তাহের মধ্যে শিশুদেহে এই রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তিশালী রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি গড়ে ওঠার কথা। তবে সম্প্রতি দেওয়া গণ-টিকার পর দেশের শিশুদের শরীরে আদৌ উপযুক্ত ইমিউনিটি তৈরি হয়েছে কি না, তা যাচাই করার জন্য সরকারিভাবে কোনো ল্যাব পরীক্ষা বা উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান মনে করেন, দেশের যেসব এলাকায় সংক্রমণের প্রকোপ অনেক বেশি, সেখানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রক্ত পরীক্ষা করে প্রতিরোধ ব্যবস্থার মাত্রা পরীক্ষা করে দেখা উচিত। যদি দেখা যায় টিকা নেওয়া সত্ত্বে শিশুদের শরীরে পর্যাপ্ত ইমিউনিটি গড়ে ওঠেনি, তবে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের পুনরায় টিকা বা বুস্টার দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

টিকা বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম বারী এই বিষয়ে জোর দিয়ে বলেন, আমরা একাধিকবার সরকারকে অনুরোধ করেছি যে, টিকা নেওয়ার পর শিশুর শরীরে পর্যাপ্ত প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হলো কি না তা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হতে। যদি রক্ত পরীক্ষায় প্রতি মিলিলিটারে প্রতিরোধ ক্ষমতার মাত্রা অন্তত ১২০ আইইউ/এমএল পাওয়া যায়, তবেই সেই শিশুকে ঝুঁকিমুক্ত হিসেবে ধরে নেওয়া যায়। নতুবা যেসব শিশুর মধ্যে এই কাঙ্ক্ষিত সুরক্ষা তৈরি হয়নি, তাদের পুনরায় নতুন করে টিকাদান কর্মসূচির মূল আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি।

তবে টিকার বাইরে থেকে যাওয়া বিশাল শিশুগোষ্ঠীকে নিয়েও এখন বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। গত মার্চ মাসে দেশে হাম মারাত্মকভাবে ছড়িয়ে পড়ার পর এপ্রিল মাসজুড়ে যে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চালানো হয়, তাতে ১ কোটি ৮০ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দিয়ে শতভাগের বেশি সাফল্য দাবি করে সরকার। কিন্তু তার ঠিক এক মাস পরই জুন মাসের ২৮ তারিখে চালুকৃত ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানোর জাতীয় অভিযানে সমবয়সী শিশুর সংখ্যা দাঁড়ায় ২ কোটি ২৬ লাখ। দুই সরকারি হিসাব পর্যালোচনা করলেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে প্রায় ৪৫ থেকে ৪৬ লাখ শিশু হামের বিশেষ টিকার সার্বিক আওতা থেকে পুরোপুরি বাদ পড়ে গিয়েছিল। যার ফলে প্রকৃত শিশুসংখ্যার বিচারে দেশের প্রায় ৮১ শতাংশ শিশু টিকা পেয়েছে এবং বাকি ১৯ শতাংশ শিশু মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম বারী এই পরিকল্পনাগত ভুল প্রসঙ্গে ব্যাখ্যা করে বলেন, কোনো বৃহৎ টিকাদান অভিযান শুরুর আগে মাঠপর্যায়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য সংগ্রহ করে মাইক্রোপ্ল্যান বা অনুপরিকল্পনা তৈরি করতে হয়। সেখানে অঞ্চলভিত্তিক জনসংখ্যা, বাড়ি বাড়ি গিয়ে সঠিক শিশু গণনা ও মাঠকর্মীদের বিভাজন স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকার নিয়ম। এবার সরকারের সেই প্রস্তুতিতে ঘাটতি ছিল। পাশাপাশি কেবল ৫ বছর পর্যন্ত শিশুদের টিকার আওতায় আনা হলেও বর্তমানে ১০ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যেও হামের উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। তাই অন্তত ১০ বছর বয়স পর্যন্ত সকল শিশুকে টিকার আওতায় না আনলে এই মহামারি থেকে সহজে মুক্তি মিলবে না।

তবে লক্ষ্যমাত্রার এই বিপুল ব্যবধান সম্পর্কে ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচির পরিচালক মো. ইউনূস আলী জানান, তারা দেশের সকল সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পাঠানো তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই ২ কোটি ২৬ লাখের লক্ষ্যমাত্রা ধরে কাজ করেছেন এবং তার ৯৯ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। অপরপক্ষে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপপরিচালক হাসানুল মাহমুদ জানান, তারা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনসংখ্যার হিসাব ধরে টিকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিলেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসও জানান, সরকারি হিসাবে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি টিকাদান সম্পন্ন হয়েছে এবং এখনো স্থায়ী কেন্দ্রগুলোতে টিকা দেওয়া অব্যাহত আছে। অভিভাবকদের অসচেতনতার কারণে কিছু শিশু বাদ পড়ে থাকতে পারে উল্লেখ করে তিনি দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাদ পড়া শিশুদের নিকটস্থ টিকাকেন্দ্রে নিয়ে এসে টিকা দেওয়ার জন্য অভিভাবকদের প্রতি জোর আহ্বান জানান।


এ সম্পর্কিত আরো খবর